সূরা আল-ফালাক (ভোর)-এর গভীর অর্থ ও তাফসির অন্বেষণ করুন—এটি বাহ্যিক ও আত্মিক অশুভ শক্তি থেকে রক্ষার এক শক্তিশালী প্রার্থনা। এর বিষয়বস্তু, গুরুত্ব এবং দৈনন্দিন জীবনে এর বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে জানুন।
সূরা ১১৩ : আল-ফালাক (প্রভাত)
ভূমিকা
সূরা আল-ফালাক হলো এক অপূর্ব প্রার্থনামূলক সূরা, যেখানে মানুষকে শেখানো হয়েছে কেবল আল্লাহর কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করতে—সব অশুভ শক্তি, অন্ধকার, হিংসা ও অদৃশ্য দুষ্ট প্রভাব থেকে। এটি এক দোয়া—যেখানে এক বিশ্বাসী আত্মা প্রভাতের আলোর ন্যায় মুক্তি ও নিরাপত্তার সন্ধান করে। এই সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এটি নবী (সা.)-কে শিক্ষা দেয় কীভাবে তিনি জাদু, হিংসা বা অশুভ চিন্তা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইবেন।
সূরা আল-ফালাক: পাঠ্যাংশ
পরম করুণাময়, অতিশয় দয়ালু আল্লাহর নামে।
(১) বলো, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি প্রভাতের পালনকর্তার নিকট—
(২) সেই সব সৃষ্টির অমঙ্গল থেকে, যা তিনি সৃষ্টি করেছেন,
(৩) অন্ধকার যখন ছেয়ে যায়, তার অমঙ্গল থেকে,
(৪) গ্রন্থির উপর ফুঁ দেওয়া জাদুকারিণীদের অমঙ্গল থেকে,
(৫) এবং হিংসুকের অমঙ্গল থেকে, যখন সে হিংসা করে।
ব্যাখ্যা (Comment)
এই সূরাটি মানুষের জীবনের চারপাশে ঘনিয়ে আসা দৃশ্যমান ও অদৃশ্য বিপদের বিরুদ্ধে এক আধ্যাত্মিক ঢাল।
“প্রভাতের পালনকর্তা”— এখানে “ফালাক” শব্দটি অর্থাৎ “প্রভাত” আলোকিত মুক্তির প্রতীক। যেমন প্রভাতের আলো অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে, তেমনি আল্লাহর করুণা দুঃখ, মন্দ ও ভয়ের পর্দা ছিন্ন করে দেয়।
“তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অমঙ্গল থেকে”— এখানে বোঝানো হয়েছে, বিশ্বজগতে যেমন সৌন্দর্য আছে, তেমনি কিছু ক্ষতিকর উপাদানও আছে। মানুষকে আল্লাহর আশ্রয়ে থাকতে হবে যেন সেই অমঙ্গল তাকে ছুঁতে না পারে।
“অন্ধকারের অমঙ্গল থেকে”— রাত্রির অন্ধকার শুধু প্রকৃতির নয়; এটি মনের অন্ধকার, অজানা ভয় ও গোপন ষড়যন্ত্রের প্রতীকও। আল্লাহর আশ্রয় সেইসব অন্ধকার চিন্তা ও কাজ থেকে মানুষকে রক্ষা করে।
“গ্রন্থির উপর ফুঁ দেওয়া”— এটি জাদু বা দুষ্ট প্রভাবের প্রতি ইঙ্গিত করে, যেখানে হিংসা ও অশুভ উদ্দেশ্যে কেউ ক্ষতি করতে চায়। আল্লাহ শেখাচ্ছেন—এসব শক্তি বাস্তব হলেও, তাঁর সুরক্ষা তার চেয়েও বাস্তব ও শক্তিশালী।
“হিংসুকের অমঙ্গল থেকে”— হিংসা এমন এক আগুন যা প্রথমে হিংসুককেই দগ্ধ করে। এই আয়াত মানুষকে শেখায় ঈর্ষা ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত থাকা এবং আল্লাহর আশ্রয়ে থাকা, যেন অন্যের হিংসা তার জীবনে প্রভাব ফেলতে না পারে।
এই সূরাটি এক ধরনের আধ্যাত্মিক ঢাল—যে ঢাল মানুষকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় অমঙ্গল থেকে রক্ষা করে।
সূরা আল-ফালাক শেখায় যে প্রকৃত নিরাপত্তা কোনো শক্তি, সম্পদ, বা জ্ঞান থেকে আসে না; আসে কেবল আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণে। এটি বিশ্বাসীকে আহ্বান জানায়—“অন্ধকারকে ভয় করো না, কারণ প্রভাতের আলোক আল্লাহর করুণায় প্রতিদিন ফিরে আসে।”
Also Read: সূরা ১০৭: আল-মাউন
সূরা আল-ফালাক সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: সূরা আল-ফালাকের মূল বিষয় কী?
উত্তর: আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া—সব অশুভ শক্তি, অন্ধকার, জাদু, ও হিংসা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য।
প্রশ্ন ২: “আল-ফালাক” শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: “আল-ফালাক” অর্থ প্রভাত বা আলোর উদয়—যা মুক্তি ও সুরক্ষার প্রতীক।
প্রশ্ন ৩: সূরাটিতে কয়টি আয়াত আছে?
উত্তর: সূরা আল-ফালাকে মোট ৫টি আয়াত রয়েছে।
প্রশ্ন ৪: এটি কখন অবতীর্ণ হয়েছিল?
উত্তর: এটি একটি মক্কি সূরা, নবী (সা.)-এর প্রতি কঠিন সময়ে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনার দিকনির্দেশনা হিসেবে অবতীর্ণ।
প্রশ্ন ৫: সূরাটির পাঠের উপকারিতা কী?
উত্তর: এটি মানুষকে দুষ্ট চিন্তা, হিংসা ও জাদুর প্রভাব থেকে রক্ষা করে এবং আত্মাকে শান্ত রাখে।
প্রশ্ন ৬: সূরা ফালাক কাদের জন্য শিক্ষা দেয়?
উত্তর: এটি প্রত্যেক মানুষের জন্য শিক্ষা—যেন তারা সব সময় আল্লাহর আশ্রয়ে থাকে।
প্রশ্ন ৭: সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাসকে একত্রে কেন পাঠ করা হয়?
উত্তর: কারণ দু’টি সূরা একত্রে পাঠ করলে মানুষ বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় অমঙ্গল থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা লাভ করে। 0 0 0






